খাতা তৈরির কারখানা
কাগজ কেটে, ভাঁজ করে, মলাট দিয়ে খাতা বানানো। অনলাইনে ৩০০ পৃষ্ঠার খাতা ৳১৬৯ আর ১২০ পৃষ্ঠার ৳৭৫, অথচ এক বছরে কাগজের প্যাকেট ১০০–১৫০ টাকা বেড়েছে।
- শেষ পর্যালোচনা: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- সংস্করণ ১

খাতা তৈরির কারখানা — প্রতীকী ছবি, AI দিয়ে তৈরি; বাস্তব কোনো দোকান বা খামার নয়
- শুরুর পুঁজি
- ৳১,৫০,০০০ – ৳৭,০০,০০০ সম্পাদকীয় অনুমান
- জনবল
- ৩ – ১৫ জন
- প্রথম বিক্রি
- ১৫ – ৪৫ দিন সম্পাদকীয় অনুমান
- খরচ উঠতে
- ১২ – ১৮ মাস সম্পাদকীয় অনুমান
- কাজের ধরন
- ওয়ার্কশপ · মাঝারি কঠিন
ব্যবসাটি সম্পর্কে
কাগজ কিনে মাপে কেটে, ভাঁজ করে, দাগ টেনে, মলাট লাগিয়ে সেলাই বা স্ট্যাপল করে খাতা বানানো — ছোট কারখানায় এই কাজ কয়েকজন লোক আর কয়েকটা যন্ত্রেই হয়ে যায়। কাজটা কঠিন নয়, কিন্তু হিসাবটা কঠিন। খাতার দাম বাজারে প্রায় বাঁধা, অথচ কাগজের দাম প্রতি বছর বাড়ে। সিলেটের পাইকারি বাজারে ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অফসেট কাগজের ৬৫ গ্রাম প্যাকেট ছিল ৳৩৩০, ৮০ গ্রাম ৳৪০০ আর ১০০ গ্রাম ৳৫৪০ — এক বছরে প্যাকেটপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি। সরকারি দরেও লেখার সাদা কাগজ দিস্তাপ্রতি ৳৩৪–৪০। বিক্রির দিকটা দেখা যাক। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অনলাইনে ৩০০ পৃষ্ঠার খাতা ৳১৬৯, ৩০০ পৃষ্ঠার রেজিস্টার ৳১৭৯, ২০০ পৃষ্ঠার স্পাইরাল খাতা ৳১২০ আর ১২০ পৃষ্ঠার ৳৭৫ — অর্থাৎ পৃষ্ঠাপ্রতি ৫৬ থেকে ৬৩ পয়সা। যে পাতলা খাতা আগে ১৫ টাকায় বিক্রি হতো, সিলেটে সেটিই এখন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। টাকা আসে বছরের কয়েক সপ্তাহে। নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সব বিক্রি, বাকি মাসগুলোতে কারখানা প্রায় খালি। তাই কাগজ কখন কিনবেন আর কত স্টক করবেন — এই একটি সিদ্ধান্তেই লাভ-লোকসান। দোকানদার খাতা নেয় মৌসুমের আগে, টাকা দেয় ভর্তি শেষ হওয়ার পর; সেই বাকি সামলানোর মতো টাকা হাতে না থাকলে এই ব্যবসা চালানো যায় না।
আয়-ব্যয়ের হিসাব
| খাত | পরিসর | সূত্র | সংশোধন পাঠান |
|---|---|---|---|
| মাসিক চলতি মূলধন | ৳৩৩,০০০ – ৳৮১,০০০ | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| বিক্রয় মূল্য | ৳৭৫ – ৳১৭৯ / একক | বাজারদর | |
| পরিবর্তনশীল খরচ | ৳২৮ – ৳৭৫ / একক | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| মোট লাভের হার | ৫৮% – ৬৩% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| প্রথম বিক্রি পর্যন্ত সময় | ১৫ – ৪৫ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| খরচ উঠে আসার সময় | ১২ – ১৮ মাস | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| নগদ চক্র | ৩০ – ১২০ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| অপচয় ও ক্ষতির হার | ৪% – ৮% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা | ৩০০ – ২,৫০০ | সম্পাদকীয় অনুমান |
শুরু করতে যা লাগবে
- কাগজ কাটার মেশিন, দাগ টানার ব্যবস্থা, সেলাই বা স্ট্যাপল করার যন্ত্র, ভাঁজ করার টেবিল আর ওজন মাপার নিক্তি। এই যন্ত্রগুলোর দাম নামসহ কোনো বিক্রেতার কাছ থেকে যাচাই করা যায়নি।যন্ত্রপাতি
- অফসেট বা লেখার কাগজ, মলাটের বোর্ড, আঠা, তার বা সুতা। ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সিলেটের পাইকারি বাজারে অফসেট ৬৫ গ্রাম প্যাকেট ৳৩৩০, ৮০ গ্রাম ৳৪০০, ১০০ গ্রাম ৳৫৪০; টিসিবির দরে লেখার সাদা কাগজ দিস্তাপ্রতি ৳৩৪–৪০।শুরুর মাল
- ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে বিসিক নিবন্ধন ও এনবিআরের টিআইএন — জেলার বিসিক কার্যালয় ও কর অঞ্চল থেকে জেনে নিতে হবে কোনটি আপনার আকারের কারখানার জন্য বাধ্যতামূলক। এই পাতায় ফি ও শর্ত যাচাই করা যায়নি।লাইসেন্স
- ট্রেড লাইসেন্স — সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ। ফরম ৳১০, লাইসেন্স বই ৳৫০, আদর্শ কর ৳৩০, স্ট্যাম্প ৳১৫০–৩০০, লাইসেন্স ফি ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ৳১০০–৬০,০০০; সাধারণত ৩–৫ কর্মদিবসে হয়।লাইসেন্স
- মাপে কাটা আর কম অপচয়ে কাটা। কাগজ কেটে যতটুকু বাদ যায়, ততটুকুই সরাসরি লাভ থেকে যায়।দক্ষতা
- কাগজের পাইকারি ব্যবসায়ী, মলাট ছাপানোর প্রেস, আর স্কুল-কলেজের সামনের স্টেশনারি দোকানের একটি তালিকা।সরবরাহকারী
- শুকনো ও বাতাস চলাচলের ঘর, কাগজ থাক করে রাখার জায়গা আর মাল ওঠানো-নামানোর সুবিধা। ভেজা মেঝে বা ছাদ চুইয়ে পানি পড়লে কাগজ নষ্ট।কাজের জায়গা
কাজের ধাপ
- 1ঘর নিন এমন জায়গায় যেখানে কাগজ শুকনো রাখা যায় আর ভ্যান-রিকশা এসে মাল নিতে পারে। কাগজ ভিজলে পুরো চালান নষ্ট।
- 2ট্রেড লাইসেন্স করান, আর কারখানা হিসেবে বিসিক নিবন্ধন ও টিআইএন লাগবে কি না নিজ জেলার বিসিক কার্যালয়ে জেনে নিন।
- 3কাগজের পাইকারি বাজারে গিয়ে অন্তত তিনজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্যাকেটের দর নিন আর প্রতি প্যাকেটে কত তা লিখিয়ে নিন।
- 4কোন কোন খাতা বানাবেন তা আগে ঠিক করুন — পাতলা অনুশীলন খাতা, ১২০ বা ২০০ পৃষ্ঠার খাতা, নাকি ৩০০ পৃষ্ঠার রেজিস্টার। প্রতিটির কাগজ ও মলাট আলাদা।
- 5কাটার মেশিন, দাগ টানার ব্যবস্থা আর সেলাই বা স্ট্যাপলের যন্ত্র বসান। পুরোনো যন্ত্র কিনলে চালু অবস্থায় দেখে কিনুন।
- 6একটি খাতা বানিয়ে ওজন করে দেখুন কত কাগজ গেল, আর কাটার পর কত কাগজ ফেলা গেল। এই দুটো সংখ্যা না জানলে খাতার দাম ঠিক করা যায় না।
- 7মলাট ছাপিয়ে নিন আর নিজের একটা নাম দিন। দোকানদার একই মানের খাতা বারবার পেলে তবেই আবার অর্ডার দেন।
- 8অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উৎপাদন শেষ করে ফেলুন। জানুয়ারিতে ক্লাস শুরু হয়ে গেলে নতুন খাতা নেওয়ার লোক কমে যায়।
- 9দোকানে মাল দেওয়ার সময় কত পিস, কোন দরে আর কবে টাকা — তিনটাই খাতায় লিখে দুজনে সই করুন।
- 10মৌসুম শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখুন কোন দোকানে কত বাকি পড়ে আছে। যে দোকান গতবার টাকা দেয়নি, তাকে এবার নগদে দিন।
মৌসুম
- জানুবেশি
- ফেব্রুস্বাভাবিক
- মার্চস্বাভাবিক
- এপ্রিলস্বাভাবিক
- মেস্বাভাবিক
- জুনকম
- জুলাইকম
- আগস্টবেশি
- সেপ্টেস্বাভাবিক
- অক্টোবেশি
- নভেবেশি
- ডিসেবেশি
কোন জেলায় ভালো
- খুব উপযোগীচট্টগ্রাম · বড় শহরে স্টেশনারি দোকানের সংখ্যা বেশি, আর আমদানি করা কাগজ বন্দর থেকেই আসে।
- খুব উপযোগীঢাকা · কাগজের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার আর স্কুল-কলেজের সবচেয়ে ঘন এলাকা — কাঁচামাল ও ক্রেতা দুটোই এক শহরে।
- খুব উপযোগীনারায়ণগঞ্জ · কাগজ ও মোড়কের কারখানা বলয়ের ভেতরে, আর ঢাকার পাইকারি বাজার হাতের নাগালে।
- সম্ভববগুড়া · উত্তরবঙ্গের পাইকারি কেন্দ্র; আশপাশের কয়েকটি জেলার স্টেশনারি দোকান এখান থেকেই মাল নেয়।
- সম্ভবকুমিল্লা · মহাসড়কের পাশে বড় বাজার, আর ঢাকা থেকে কাগজ আনা সহজ ও সস্তা।
- সম্ভবখুলনা · বিভাগীয় শহর, দক্ষিণ-পশ্চিমের কয়েকটি জেলায় সরবরাহের সুবিধাজনক কেন্দ্র।
- সম্ভবময়মনসিংহ · শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি আর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে কাগজ আনা যায়।
- সম্ভবরাজশাহী · বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকেন্দ্রিক শহর; খাতা ও রেজিস্টারের নিয়মিত চাহিদা আছে।
- সম্ভবসিলেট · পাইকারি বাজারে অফসেট কাগজের দর প্রকাশ্যে পাওয়া যায় (৬৫ গ্রাম ৳৩৩০, ১০০ গ্রাম ৳৫৪০), আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার অনেক।
ঝুঁকি ও সাবধানতা
- বেশিচলতি মূলধন: কাগজের দাম বাড়ে, খাতার দাম সহজে বাড়ানো যায় না। এক বছরে অফসেট কাগজের প্যাকেটপ্রতি দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে — ৬৫ গ্রামের প্যাকেট এখন ৳৩৩০, ১০০ গ্রামের ৳৫৪০। মৌসুমের আগে বেশি দামে কাগজ কিনে ফেললে সেই খরচ আর দোকানদারের কাছ থেকে তোলা যায় না, কারণ খাতার দর আগেই বলা হয়ে গেছে।
- বেশিচাহিদা: বছরের বিক্রি কয়েক সপ্তাহে। নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি — এর মধ্যে না বেচতে পারলে মাল পড়ে থাকে। খাতা পচে না ঠিকই, কিন্তু পড়ে থাকা মালে টাকা আটকে থাকে, মলাট পুরোনো হয়ে যায় আর পরের মৌসুমে দোকানদার নতুন ডিজাইন চায়।
- বেশিবাকিতে বিক্রি: দোকানদার মৌসুমের আগে বাকিতে খাতা নেন আর টাকা দেন ভর্তি শেষ হওয়ার পর। ততদিনে আপনাকে কাগজের দাম, শ্রমিকের মজুরি আর ঘরভাড়া সবই মিটিয়ে ফেলতে হয়েছে। দুই-তিনটা দোকানে টাকা আটকে গেলে পরের মৌসুমের কাগজ কেনার টাকাই থাকে না।
- মাঝারিনির্ভরশীলতা: পুরো ব্যবসাটাই একটি কাঁচামালের উপর দাঁড়িয়ে, আর সেই কাগজের দাম আপনি ঠিক করেন না। সিলেটের খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্যেই দেখা যাচ্ছে শিক্ষা উপকরণের দাম নিঃশব্দে বেড়ে চলেছে — ৫ টাকার কলম এখন পাইকারিতেই ৭ টাকা। কাগজের বাজারে সরবরাহ টান পড়লে ছোট কারখানা আগে বাদ পড়ে।
সূত্র
সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির ধাপ সমূহ
সংগ্রহ: ১৬ সেপ, ২০২৬যে হিসাবের সূত্র: শুরুর পুঁজি, প্রথম বিক্রি পর্যন্ত সময় · বাংলাদেশ
- সংগ্রহ: ১৫ সেপ, ২০২৬
যে হিসাবের সূত্র: মাসিক চলতি মূলধন · ঢাকা মহানগর — সিপাহীবাগ, মিরপুর-৬, মোহাম্মদপুর টাউন হল, নিউমার্কেট, রামপুরা, মহাখালী বাজার
কী বদলেছে
এখনো কোনো সংশোধন প্রকাশ হয়নি।
প্রশ্নোত্তর
এখনো কেউ প্রশ্ন করেননি। আপনিই প্রথম প্রশ্ন করুন।
এই ব্যবসার গল্প
কলমে লাভ ৪ টাকা, খাতায় ৫ — ১০ হাজারের বিক্রিতে হাতে থাকে ৩–৪ হাজার
২০২৩ সালের মার্চে খাতা বানানো শুরু, নভেম্বরে কাগজের কলম। এখন মাসে ৯,০০০–১০,০০০ টাকার বিক্রি, ৫০০ টাকার দোকানভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাদে হাতে থাকে ৩,০০০–৪,০০০ টাকা।
- কারণ
- চলতি মূলধন, পরিবার বা স্বাস্থ্য
একই রকম আরও ব্যবসা
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপজুতা তৈরির কারখানা
ছোট কারখানায় স্যান্ডেল ও জুতা বানিয়ে পাইকারের কাছে বিক্রি। স্যান্ডেল ৳২৫০–৭০০, চামড়ার জুতা ৳১,২০০। ভৈরবে ৩,৫০০–৫,০০০ কারখানায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষ কাজ করেন।
- পুঁজি
- ৳১.৫ লাখ – ৳১০ লাখ
- জনবল
- ৪ – ২০ জন
- প্রথম আয়
- ৩০ – ৯০ দিন
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপথাই গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম
অ্যালুমিনিয়াম ও কাচ মেপে কেটে দরজা-জানালা-পার্টিশন বানিয়ে লাগানো। সাধারণ কাজের দর প্রতি বর্গফুট ৳৪৭০–৭৫০, আর মাপ ভুল হলে কাটা মাল ফেরত যায় না।
- পুঁজি
- ৳১.৫ লাখ – ৳৬ লাখ
- জনবল
- ২ – ৬ জন
- প্রথম আয়
- ২০ – ৬০ দিন
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপআগর-আতর উৎপাদন
আগরগাছের কাঠ ভিজিয়ে জ্বাল দিয়ে সুগন্ধি আতর নামানো। বড়লেখার সুজানগরে প্রায় ২৫০টি কারখানা, মানভেদে তোলাপ্রতি ৳৬,০০০–১০,০০০, আর প্রায় পুরোটাই রপ্তানি হয়।
- পুঁজি
- ৳১.৫ লাখ – ৳১০ লাখ
- জনবল
- ৩ – ১৫ জন
- প্রথম আয়
- ২,৫৫৫ – ১০,৯৫০ দিন
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপকাঠের ফার্নিচার ওয়ার্কশপ
অর্ডার নিয়ে খাট-আলমারি-টেবিল বানানো। এমডিএফের খাট ৳১২,০০০ থেকে, পুরো সেগুনের কিং খাট ৳১,৮০,০০০ পর্যন্ত — কিন্তু কাঠ কিনতে হয় আগে, টাকা আসে ডেলিভারির পরে।
- পুঁজি
- ৳১.৫ লাখ – ৳১২ লাখ
- জনবল
- ২ – ১০ জন
- প্রথম আয়
- ৩০ – ৯০ দিন
