কাঠের খেলনা তৈরি
আসবাবের কারখানার ফেলে দেওয়া কাঠের টুকরা দিয়ে শিশুদের খেলনা বানানো। বিসিকের মেলায় কাঠের পণ্য ৳১০০ থেকে ৳৩,০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
- শেষ পর্যালোচনা: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- সংস্করণ ১

কাঠের খেলনা তৈরি
- শুরুর পুঁজি
- ৳২০,০০০ – ৳৩,০০,০০০ সম্পাদকীয় অনুমান
- জনবল
- ১ – ১০ জন
- প্রথম বিক্রি
- ৩০ – ১২০ দিন সম্পাদকীয় অনুমান
- খরচ উঠতে
- ৩ – ৮ মাস সম্পাদকীয় অনুমান
- কাজের ধরন
- ওয়ার্কশপ · মাঝারি কঠিন
ব্যবসাটি সম্পর্কে
কাঠের টমটম, গাড়ি, পুতুল, নৌকা, ঘূর্ণি — মেলার এইসব খেলনা এখনো হাতেই বানানো হয়, আর বানান গুটিকয়েক গ্রামের কারিগরেরা। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার খোলাস গ্রাম এখন 'খেলনা গ্রাম' নামেই পরিচিত; ধাপ সুলতানগঞ্জহাট থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে সেই গ্রামের অন্তত ১০০টি ঘরে বছরজুড়ে খেলনা তৈরি হয়, আর সবচেয়ে বেশি চলে টমটম। বিক্রি বাড়ে বৈশাখের আগে, পূজার আগে আর শীতের মেলার মৌসুমে। এই কাজের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কাঁচামাল। আসবাবের কারখানায় যে কাঠের টুকরা ফেলে দেওয়া হয়, খেলনার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট — তাই কাঁচামালের খরচ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি রাখা যায়। দাম কেমন? ২০২৫ সালের অক্টোবরে তেজগাঁওয়ে বিসিকের শরৎ মেলায় ইনভেন্ট ক্র্যাফটস নামের প্রতিষ্ঠান কাঠের কলম, চিরুনি, হ্যাঙ্গার, চাবির রিং ও শিশুদের খেলনা ৳১০০ থেকে ৳৩,০০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করেছে। কিন্তু একটা কঠিন সত্যও আছে। খোলাস গ্রামের কারিগরেরা দাদনের ফাঁদে আটকে আছেন — আগাম টাকা নিয়ে কাজ করেন বলে দাম ঠিক করার ক্ষমতা তাঁদের হাতে থাকে না। যিনি নিজের পুঁজিতে বানিয়ে নিজে মেলায় বা অনলাইনে বিক্রি করতে পারবেন, লাভের বড় অংশ তাঁর ঘরেই থাকবে।
আয়-ব্যয়ের হিসাব
| খাত | পরিসর | সূত্র | সংশোধন পাঠান |
|---|---|---|---|
| মাসিক চলতি মূলধন | ৳১০,০০০ – ৳১,৫০,০০০ | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| বিক্রয় মূল্য | ৳১০০ – ৳৩,০০০ / একক | বাজারদর | |
| পরিবর্তনশীল খরচ | ৳৩৫ – ৳১,১০০ / একক | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| মোট লাভের হার | ৬৩% – ৬৫% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| প্রথম বিক্রি পর্যন্ত সময় | ৩০ – ১২০ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| খরচ উঠে আসার সময় | ৩ – ৮ মাস | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| নগদ চক্র | ০ – ৪৫ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| অপচয় ও ক্ষতির হার | ৫% – ১০% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা | ১৫ – ২০০ | সম্পাদকীয় অনুমান |
শুরু করতে যা লাগবে
- করাত, বাটালি, ড্রিল, লেদ বা ঘোরানোর চাকা, শিরিষ কাগজ, রং ও বার্নিশের সরঞ্জাম। যন্ত্রের দর এই গবেষণায় যাচাই করা যায়নি।যন্ত্রপাতি
- রং, বার্নিশ, আঠা, পেরেক, চাকা ও অক্ষের কাঠি। শিশুদের পণ্য বলে সিসামুক্ত রং ব্যবহার করতে হবে।শুরুর মাল
- ট্রেড লাইসেন্স — সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা। ফরম ৳১০, লাইসেন্স বই ৳৫০, আদর্শ কর ৳৩০, স্ট্যাম্প ৳১৫০–৩০০, লাইসেন্স ফি ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ৳১০০–৬০,০০০। ৩–৫ কার্যদিবসে ইস্যু, বছর বছর নবায়ন।লাইসেন্স
- কাঠ কাটা, চাকা ও অক্ষ বসানো, মসৃণ করা আর রং করা। কোণা ধারালো না রাখা আর জোড়া মজবুত করা — শিশুদের পণ্যে এই দুটোই সবচেয়ে জরুরি।দক্ষতা
- আসবাবের কারখানা ও করাতকল — খেলনার কাঠ আসে তাদের ফেলে দেওয়া টুকরা থেকে। এই সম্পর্কই কাঁচামালের খরচ কম রাখার চাবি।সরবরাহকারী
- ধুলা ও শব্দ সহ্য করার মতো কাজের জায়গা, আর রং শুকানোর জন্য আলাদা ছাদ-দেওয়া ঘর। বাড়ির উঠানেও শুরু করা যায়।কাজের জায়গা
কাজের ধাপ
- 1আশপাশের আসবাবের কারখানা ও করাতকলের সঙ্গে কথা বলুন। খেলনার জন্য যে মাপের কাঠ লাগে, তা আসবাবের কাজে ফেলে দেওয়া টুকরা থেকেই পাওয়া যায় — এটাই এই ব্যবসার আসল সুবিধা।
- 2কোন কাঠ ব্যবহার করবেন ঠিক করুন। নরম ও হালকা কাঠ কাটা সহজ ও ওজনে কম, কিন্তু সহজে ভাঙে; শক্ত কাঠ টেকে বেশি কিন্তু কাজে সময় লাগে। খেলনা শিশুদের জন্য, তাই ভাঙা কাঠের কোণা চলবে না।
- 3কয়েকটি নকশা বেছে নিন আর সেগুলোই বারবার বানান। খোলাস গ্রামে সবচেয়ে বেশি চলে টমটম — একটি নকশা বারবার বানালে হাত দ্রুত হয় আর খরচ কমে।
- 4যন্ত্রপাতি জোগাড় করুন: করাত, বাটালি, ড্রিল, লেদ বা ঘোরানোর চাকা, শিরিষ কাগজ আর রং করার সরঞ্জাম।
- 5রং ও বার্নিশে সিসা বা বিষাক্ত উপাদান নেই কি না নিশ্চিত হন। শিশুরা খেলনা মুখে দেয়; রপ্তানির ক্রেতারাও এটি আগে দেখে।
- 6সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিন।
- 7বিসিকে নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণের খোঁজ নিন। বিসিক নিয়মিত হস্তশিল্পের মেলা করে — ২০২৫ সালের অক্টোবরে তেজগাঁওয়ে পাঁচ দিনের শরৎ মেলায় ৪০ জন উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছিলেন। মেলায় বিক্রি করলে মাঝখানের মহাজন বাদ পড়ে যায়।
- 8মেলার তারিখ ধরে উৎপাদনের পরিকল্পনা করুন। বৈশাখের আগে, পূজার আগে আর শীতের মেলার মৌসুমেই বিক্রির বড় অংশ হয়। মেলার আগে মাল তৈরি না থাকলে পুরো মৌসুম হাতছাড়া হয়।
- 9দাদন নেওয়ার আগে দুবার ভাবুন। খোলাস গ্রামের কারিগরেরা দাদনের ফাঁদে আটকে আছেন — আগাম টাকা নিলে দাম ঠিক করার ক্ষমতা মহাজনের হাতে চলে যায় আর ঋণ শোধ হয় না।
- 10অনলাইনে বিক্রির চেষ্টা করুন। দারাজে কাঠের শিক্ষামূলক খেলনা ও সেট ৳৭৩ থেকে ৳৯৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে (১৬-০৯-২০২৬), যার বেশির ভাগই আমদানি করা — দেশি কারিগরের জন্য সেখানে জায়গা খালি আছে।
- 11রপ্তানির দিকে তাকান। মাগুরার আঙ্গারদাহ গ্রামের বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড দেশীয় কাঁচামালে পোষা প্রাণীর খেলনা ও খাবার বানিয়ে ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার পণ্য জাপান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানি করেছে — গ্রামীণ কাঁচামাল দিয়ে রপ্তানি সম্ভব, এটিই তার প্রমাণ।
মৌসুম
- জানুস্বাভাবিক
- ফেব্রুস্বাভাবিক
- মার্চবেশি
- এপ্রিলবেশি
- মেস্বাভাবিক
- জুনস্বাভাবিক
- জুলাইস্বাভাবিক
- আগস্টস্বাভাবিক
- সেপ্টেবেশি
- অক্টোবেশি
- নভেস্বাভাবিক
- ডিসেস্বাভাবিক
কোন জেলায় ভালো
- খুব উপযোগীবগুড়া · দুপচাঁচিয়া উপজেলার খোলাস গ্রাম 'খেলনা গ্রাম' নামে পরিচিত; অন্তত ১০০টি ঘরে বছরজুড়ে খেলনা তৈরি হয় আর ধাপ সুলতানগঞ্জহাট দেড় কিলোমিটার দূরে।
- খুব উপযোগীঢাকা · সবচেয়ে বড় ক্রেতাবাজার, উপহার ও হস্তশিল্পের দোকান, আর বিসিকের মেলা তেজগাঁওয়েই হয়।
- খুব উপযোগীনীলফামারী · সৈয়দপুরে কাঠের খেলনা তৈরির পুরোনো ঐতিহ্য ও কারিগর আছেন।
- সম্ভবচট্টগ্রাম · বড় ভোক্তাবাজার ও রপ্তানিকারকের উপস্থিতি; বন্দর কাছে।
- সম্ভবগাজীপুর · আসবাবের কারখানার ঘনত্ব বেশি, তাই কাঠের টুকরার জোগান সহজ।
- সম্ভবযশোর · কাঠ ও হস্তশিল্পের কারিগর পাওয়া যায়, আর পশ্চিমাঞ্চলের মেলার বাজার কাছে।
- সম্ভবকুষ্টিয়া · গ্রামীণ মেলার বাজার বড়, আর করাতকল ও আসবাবের কারখানা আছে।
- সম্ভবমাগুরা · আঙ্গারদাহ গ্রামের বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড দেশীয় কাঁচামালে খেলনা বানিয়ে জাপান, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করছে; রপ্তানিমুখী কাজের অভিজ্ঞতা স্থানীয়ভাবে আছে।
- সম্ভবনওগাঁ · খেলনা ও বাঁশি তৈরির গ্রামীণ কারিগর আছেন, আর বগুড়ার বাজার কাছে।
ঝুঁকি ও সাবধানতা
- বেশিনির্ভরশীলতা: দাদনই এই পেশার সবচেয়ে বড় ফাঁদ। বগুড়ার খোলাস গ্রামের কারিগরেরা মহাজনের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে কাজ করেন, ফলে নিজের পণ্যের দাম নিজে ঠিক করতে পারেন না। প্রথম আলোর প্রতিবেদনের ভাষায়, খেলনা তৈরির ব্যস্ততার আড়ালে অসংখ্য পরিবারের দুঃখের গল্প লুকিয়ে আছে। একবার দাদনে ঢুকলে লাভের বড় অংশ মহাজনের ঘরেই যায়।
- বেশিচাহিদা: আধুনিক ও প্লাস্টিকের খেলনার সঙ্গে দামে ও চেহারায় লড়াই কঠিন। দারাজে শিশুদের কাঠের খেলনার সেট ৳৭৩ থেকে ৳৯৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে (১৬-০৯-২০২৬) আর তার বেশির ভাগই আমদানি করা, নকশায় ঝকঝকে। শিশুরা মেলায় যা দেখে তাই চায়, আর দোকানে প্লাস্টিকের খেলনা সস্তা ও রঙিন।
- মাঝারিচাহিদা: বিক্রি মেলার ওপর দাঁড়িয়ে। বৈশাখ, পূজা ও শীতের মেলাতেই বিক্রির বড় অংশ হয়। মেলা বন্ধ হলে বা আবহাওয়া খারাপ থাকলে পুরো মৌসুমের মাল হাতে পড়ে থাকে, অথচ সেই মাল বানাতে আগেই টাকা খরচ হয়ে গেছে।
- মাঝারিঅন্যান্য: কাঠের টুকরার জোগান নিশ্চিত নয়। আসবাবের কারখানা টুকরা বিক্রি করে দিতে পারে, পুড়িয়ে ফেলতে পারে বা অন্য কাউকে দিয়ে দিতে পারে। একটি কারখানার ওপর নির্ভর করলে সেই সম্পর্ক ভাঙলেই কাঁচামালের খরচ হঠাৎ বেড়ে যায়।
সূত্র
সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির ধাপ সমূহ
সংগ্রহ: ১৬ সেপ, ২০২৬যে হিসাবের সূত্র: শুরুর পুঁজি · বাংলাদেশ
কী বদলেছে
এখনো কোনো সংশোধন প্রকাশ হয়নি।
প্রশ্নোত্তর
এখনো কেউ প্রশ্ন করেননি। আপনিই প্রথম প্রশ্ন করুন।
এই ব্যবসার গল্প
মেলা বন্ধ, গুদামে নষ্ট ৯০ হাজার টাকার খেলনা, পরের বছরও পড়ে রইল ৬০ হাজারের মাল
চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ — তিন মাসের মেলাই এই কাঠের খেলনার পুরো বাজার। এক বছরে গুদামে নষ্ট হয় ৯০,০০০ টাকার খেলনা, পরের মৌসুমের জন্য ধারে বানানো ৬০,০০০ টাকার মালও পড়ে থাকে।
- পুঁজি
- ৳৬০ হাজার
- কারণ
- নির্ভরশীলতা, নষ্ট হওয়া
একই রকম আরও ব্যবসা
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপনকশি কাঁথা
কাপড় স্তরে স্তরে সাজিয়ে সুই-সুতায় নকশা তোলা কাঁথা। জামালপুরে মজুরিসহ খরচ ৳১,৬০০–১,৮০০, ঢাকার পাইকারকে বিক্রি ৳২,০০০, আর ঢাকার দোকানে সেটাই ৳৪,০০০–৫,০০০।
- পুঁজি
- ৳২০ হাজার – ৳২ লাখ
- জনবল
- ১ – ২৫ জন
- প্রথম আয়
- ৩০ – ৩৬৫ দিন
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপমোমবাতি ও সাবান তৈরি
অল্প পুঁজিতে ছোট কারখানায় মোমবাতি ও সাবান তৈরি। সাবান বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক তালিকায় — সিএম লাইসেন্স ছাড়া বিক্রি করা যাবে না; মোমবাতি তালিকার বাইরে।
- পুঁজি
- ৳২০ হাজার – ৳৪ লাখ
- জনবল
- ১ – ১০ জন
- প্রথম আয়
- ১৯ – ৯৪ দিন
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপসাইকেল ও রিকশা মেরামত
রাস্তার পাশে ছোট দোকানে সাইকেল, রিকশা ও ই-রিকশা মেরামত। যন্ত্রপাতি ও মালের দাম মিলিয়ে ৳১৫,০০০ থেকেই শুরু করা যায়, আর খদ্দের কাজ শেষে নগদ টাকা দিয়ে যান।
- পুঁজি
- ৳১৫ হাজার – ৳১.২ লাখ
- জনবল
- ১ – ৩ জন
- প্রথম আয়
- ৭ – ৩০ দিন
হালকা উৎপাদন ও ওয়ার্কশপকাগজের ঠোঙা ও প্যাকেজিং
বর্জ্য কাগজ কিনে হাতে ঠোঙা বানিয়ে দোকানে সরবরাহ। খাকি ঠোঙা কেজি ৳১৩৫–১৪০, সাদা ৳৮০; ৬০ কেজি কাগজে সাড়ে ৭ হাজার খরচে ৭০ কেজি ঠোঙা, লাভ ২,৩০০ টাকা।
- পুঁজি
- ৳১০ হাজার – ৳৬০ হাজার
- জনবল
- ১ – ২০ জন
- প্রথম আয়
- ৩ – ১৫ দিন
