চালের মিল
ধান কিনে সেদ্ধ-শুকিয়ে চাল করে বিক্রি। ২৪ হাজার কেজি ধানে চাল হয় ১৫ হাজার কেজি, আর তুষ-কুঁড়া-খুদ বেচে চালের কেজিতে আরও ৳৬.৪৫ ফেরত আসে।
- শেষ পর্যালোচনা: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- সংস্করণ ১

চালের মিল
- শুরুর পুঁজি
- ৳৫,০০,০০০ – ৳৫০,০০,০০০ সম্পাদকীয় অনুমান
- জনবল
- ৪ – ২০ জন
- প্রথম বিক্রি
- ৩০ – ১২০ দিন সম্পাদকীয় অনুমান
- খরচ উঠতে
- ১২ – ২৪ মাস সম্পাদকীয় অনুমান
- কাজের ধরন
- ওয়ার্কশপ · কঠিন
ব্যবসাটি সম্পর্কে
চালের মিল মানে ধান কিনে সেদ্ধ করা, শুকানো, ছাঁটাই করা আর চাল বিক্রি করা। এই ব্যবসার আসল অঙ্কটা একটাই — এক মণ ধানে কত কেজি চাল হয়, আর বাকিটা কোথায় যায়। এক হিসাবে ৬০০ মণ, অর্থাৎ ২৪ হাজার কেজি ধান থেকে চাল পাওয়া গেছে ১৫ হাজার কেজি। মানে ধানের ওজনের ৬২ শতাংশের মতো চাল, বাকি ৩৮ শতাংশ তুষ, কুঁড়া, খুদ আর ভাঙা চাল। ওই বাকিটাই অনেকে হিসাবে ধরেন না, অথচ সেটাই লাভ ঠিক করে দেয়। একই হিসাবে উপজাত বিক্রি হয়েছে ৯৬ হাজার ৭২০ টাকায় — পলিশ ১,৪৭০ কেজি ৳৩৮ দরে, কাটা চাল ৪০০ কেজি ৳৩২, কালো চাল ৪০০ কেজি ৳২৮, ক্রিম খুদ ২৫০ কেজি ৳৩০ আর পলিশ খুদ ৩৬০ কেজি ৳২৬ দরে। তুষ মিলমালিক বিনা পয়সায় পান। ওই ৯৬ হাজার টাকা ১৫ হাজার কেজি চালের উপর ভাগ করলে দাঁড়ায় কেজিতে ৬ টাকা ৪৫ পয়সা। চাল বিক্রি হয় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার পাইকারি বাজারে মোটা ৳৪৩–৪৫, মাঝারি ৳৪৬–৫০ কেজি দরে। কিন্তু ছোট হাসকিং মিল এখন টিকতে পারছে না। দিনাজপুরে ২০১৯ সালে ২ হাজার ১৮০টি হাসকিং মিল চলত, ২০২৫ সালে চলে ৭০৩টি। কারণ একটা অটো রাইস মিল প্রায় ২০টি হাসকিং মিলের সমান কাজ করে, আর কৃষিঋণের সুদ ৯ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে।
আয়-ব্যয়ের হিসাব
| খাত | পরিসর | সূত্র | সংশোধন পাঠান |
|---|---|---|---|
| মাসিক চলতি মূলধন | ৳৫,০০,০০০ – ৳২৮,০০,০০০ | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| বিক্রয় মূল্য | ৳৪৩ – ৳৫০ / কেজি | সরকারি সূত্র | |
| পরিবর্তনশীল খরচ | ৳২৮ – ৳৩২ / কেজি | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| মোট লাভের হার | ১০% – ৩০% | বিতর্কিত | |
| প্রথম বিক্রি পর্যন্ত সময় | ৩০ – ১২০ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| খরচ উঠে আসার সময় | ১২ – ২৪ মাস | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| নগদ চক্র | ১৫ – ৪৫ দিন | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| অপচয় ও ক্ষতির হার | ৩৭% – ৩৮% | সম্পাদকীয় অনুমান | |
| দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা | ১,০০০ – ৫,০০০ | সম্পাদকীয় অনুমান |
শুরু করতে যা লাগবে
- হাসকার, পলিশার, চালুনি ও ব্লোয়ার, প্ল্যাটফর্ম ওজন মেশিন, আর্দ্রতা মাপার যন্ত্র, বস্তা সেলাইয়ের মেশিন।যন্ত্রপাতি
- খাদ্যশস্য ও খাদ্য সামগ্রী ব্যবসার লাইসেন্স (চালকল) — জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ফি ও কর্তৃপক্ষ অনুযায়ী। নবায়নযোগ্য।লাইসেন্স
- ট্রেড লাইসেন্স — সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা। ফরম ৳১০, লাইসেন্স বই ৳৫০, আদর্শ কর ৳৩০, স্ট্যাম্প ৳১৫০–৩০০, লাইসেন্স ফি ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ৳১০০–৬০,০০০। ৩–৫ কার্যদিবসে হয়।লাইসেন্স
- আর্দ্রতা দেখে ধান কেনা, সেদ্ধ ও শুকানোর সময় ধরা, আর ব্যাচ ধরে চাল-খুদ-কুঁড়ার হিসাব রাখা। ভুল সেদ্ধ হলে চাল ভেঙে যায় আর দাম পড়ে যায়।দক্ষতা
- ধানের নিয়মিত উৎস — হাটের ব্যাপারী বা হাওরের আড়ত। মৌসুমে কিশোরগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরের আড়ত থেকে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর ও জামালপুরের চাতালে ট্রাকভর্তি ধান যায়।সরবরাহকারী
- উপজাতের ক্রেতা — কুঁড়া ও খুদের জন্য গো-খাদ্য ও রাইস ব্রান অয়েল কারখানা, তুষের জন্য জ্বালানির ক্রেতা।সরবরাহকারী
- চাতাল অর্থাৎ ধান শুকানোর খোলা উঠান, সেদ্ধ করার চৌবাচ্চা, যন্ত্রঘর আর ধান-চালের গুদাম। ট্রাক ঢোকার রাস্তা লাগবে।কাজের জায়গা
কাজের ধাপ
- 1ধানের এলাকায় জায়গা নিন। মিল ধানের কাছে থাকলে পরিবহন খরচ কমে, আর চাতাল বসানোর জন্য খোলা উঠান লাগে।
- 2বিদ্যুৎ সংযোগ আর পানির ব্যবস্থা করুন — সেদ্ধ করতে পানি আর ছাঁটাইয়ে বিদ্যুৎ, দুটোই লাগে।
- 3ট্রেড লাইসেন্স নিন এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে চালকলের লাইসেন্স করান।
- 4যন্ত্র বসান: সেদ্ধ করার চৌবাচ্চা বা বয়লার, হাসকার, পলিশার আর খুদ-কুঁড়া আলাদা করার চালুনি।
- 5ধানের উৎস ঠিক করুন — হাটের ব্যাপারী, না হাওরের আড়ত। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের মতো নৌবন্দরের আড়ত থেকে ট্রাকে ধান সরাসরি চাতালে আসে।
- 6ধান কেনার সময় আর্দ্রতা মাপুন। ভেজা ধান বেশি ওজনে কিনলে চাল কম হয়, আর ওখানেই লাভটা চলে যায়।
- 7প্রতিটি ব্যাচের হিসাব রাখুন: কত মণ ধান ঢুকল, কত কেজি চাল বের হলো, আর কত কেজি খুদ-কুঁড়া-তুষ হলো।
- 8উপজাতের ক্রেতা আলাদা করে ধরুন — কুঁড়া ও খুদ যায় গো-খাদ্য ও তেল কারখানায়, তুষ যায় জ্বালানিতে। এই বিক্রি চালের কেজিতে প্রায় ৳৬.৪৫ ফেরত দেয়।
- 9চালের পাইকার ও আড়তদারের সঙ্গে দর ঠিক করুন, আর খাদ্য অধিদপ্তরের চুক্তিবদ্ধ সংগ্রহে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না দেখুন।
- 10ঋণের হিসাব কড়া রাখুন। কৃষিঋণের সুদ ৯ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে, আর দিনাজপুরে অনেক মিলমালিক ঋণ শোধ করতে না পেরে খেলাপি হয়েছেন।
- 11মৌসুমের বাইরেও চলার পরিকল্পনা করুন। ধান ওঠার সময় মিল ভরা থাকে, তারপর মাসের পর মাস কম চলে, অথচ শ্রমিক ও ঋণের কিস্তি থামে না।
মৌসুম
- জানুবেশি
- ফেব্রুস্বাভাবিক
- মার্চস্বাভাবিক
- এপ্রিলবেশি
- মেবেশি
- জুনবেশি
- জুলাইস্বাভাবিক
- আগস্টস্বাভাবিক
- সেপ্টেস্বাভাবিক
- অক্টোস্বাভাবিক
- নভেবেশি
- ডিসেবেশি
কোন জেলায় ভালো
- খুব উপযোগীবগুড়া · উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যকেন্দ্র; ধান, যন্ত্রপাতি ও চালের ক্রেতা তিনটাই কাছে।
- খুব উপযোগীদিনাজপুর · দেশের অন্যতম বড় চালকল এলাকা, তবে এখানেই হাসকিং মিল সবচেয়ে দ্রুত বন্ধ হচ্ছে — ২০১৯ সালের ২,১৮০টি থেকে ২০২৫ সালে ৭০৩টি।
- খুব উপযোগীকুষ্টিয়া · সরু চালের বড় মোকাম; মিনিকেট ধরনের চাল এখান থেকেই দেশজুড়ে যায়।
- খুব উপযোগীনওগাঁ · চাতাল ঘন, আর হাওরের আড়ত থেকে ট্রাকে ধান সরাসরি এখানে আসে।
- সম্ভবচাঁপাইনবাবগঞ্জ · হাওরের ধানের গন্তব্য চাতাল এলাকা; মৌসুমে ধান সস্তা।
- সম্ভবগাইবান্ধা · ধান উৎপাদনের এলাকা, তবে বড় ক্রেতাবাজার দূরে।
- সম্ভবজামালপুর · একই ধরনের চাতাল এলাকা, ঢাকায় চাল পাঠানোর পথ সুবিধাজনক।
- সম্ভবকিশোরগঞ্জ · হাওরের ধান হাতের কাছে — করিমগঞ্জের চামড়া নৌবন্দরে মৌসুমে প্রায় ৪০টি আড়ত বসে।
- সম্ভবরাজশাহী · চাতাল এলাকা এবং ধানের বড় বাজার; অটো মিলের প্রতিযোগিতাও বেশি।
- সম্ভবশেরপুর · কিশোরগঞ্জের হাওর থেকে ধান আসা চাতাল এলাকা।
- সম্ভবসিরাজগঞ্জ · মহাসড়কের উপর, ধান ও চাল দুই দিকেই পরিবহন সহজ।
ঝুঁকি ও সাবধানতা
- মাঝারিনষ্ট হওয়া: ভুল সেদ্ধ বা কম শুকানো ধান থেকে চাল ভেঙে যায়, আর ভাঙা চাল কেজিতে ৳৩২ দরে যায় যেখানে গোটা চাল ৳৪৩–৫০। বর্ষায় চাতালে ধান শুকানো যায় না, আর ভেজা ধান গুদামে রাখলে পচে যায় বা গন্ধ হয়।
- মাঝারিচাহিদা: চালের দাম পড়লে গুদামের পুরো মজুতের দাম পড়ে। ১৫-০৯-২০২৬-এ ঢাকার পাইকারি বাজারে মোটা চাল গত বছরের একই দিনের চেয়ে ১৪.৫৬ শতাংশ কম, মাঝারি চাল ১৫.০৪ শতাংশ কম। অথচ ধান আগেই কেনা হয়ে গেছে।
- মাঝারিআইনি বাধ্যবাধকতা: ধান-চালের মজুতবিরোধী অভিযানে চালকল বারবার লক্ষ্য হয়। লাইসেন্সের সীমার বেশি মজুত পেলে জরিমানা, মাল জব্দ ও লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি থাকে — অথচ মৌসুমে সস্তায় ধান তুলে রাখাই মিলের স্বাভাবিক কাজ।
- বেশিনির্ভরশীলতা: অটো রাইস মিলের কাছে ছোট হাসকিং মিল হেরে যাচ্ছে। দিনাজপুরে ২০১৯ সালে ২,১৮০টি হাসকিং মিল চলত, ২০২৫ সালে ৭০৩টি — পাঁচ বছরে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বন্ধ। একটা অটো মিল প্রায় ২০টি হাসকিং মিলের সমান কাজ করে, কোনো কোনো কর্পোরেট মিল ৩০টির সমান। ক্রেতা চকচকে চাল চায়, আর হাসকিং মিলের লালচে চাল সেই বাজারে দাম পায় না।
- বেশিচলতি মূলধন: মৌসুমে ধান কিনতে একসঙ্গে বড় টাকা লাগে, আর চাল বিক্রির টাকা আসে পরে। অনেক মিলমালিক তাই ঋণ নেন, কিন্তু কৃষিঋণের সুদ ৯ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। দিনাজপুরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেশি ঋণ নিয়ে আয় না হওয়ায় অনেকে খেলাপি হয়ে গেছেন।
সূত্র
সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির ধাপ সমূহ
সংগ্রহ: ১৬ সেপ, ২০২৬যে হিসাবের সূত্র: শুরুর পুঁজি · বাংলাদেশ
ঢাকা মহানগরীর বাজারসমূহের নিত্য প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের পাইকারী বাজারদর, ১৫-০৯-২০২৬
সংগ্রহ: ১৫ সেপ, ২০২৬যে হিসাবের সূত্র: বিক্রয় মূল্য · ঢাকা মহানগরী (১১টি বাজার)
কী বদলেছে
এখনো কোনো সংশোধন প্রকাশ হয়নি।
প্রশ্নোত্তর
এখনো কেউ প্রশ্ন করেননি। আপনিই প্রথম প্রশ্ন করুন।
এই ব্যবসার গল্প
মণে খরচ ২,৪০০ টাকা, চাল বিক্রি ২,২৫০ — উপজেলায় বন্ধ ২৩৩টি চালকল
সনাতন হাসকিং চালকলে মণপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ২,৪০০ টাকা, অথচ চাল বিক্রি হয় ২,২৫০ টাকায় — মণে লোকসান ১৫০–২০০ টাকা। উপজেলার ২৩৩টি চালকল বন্ধ, কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৭,০০০ শ্রমিক।
- কারণ
- দাম পড়ে যাওয়া, চলতি মূলধন
একই রকম আরও ব্যবসা
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণচা প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিং
নিলাম থেকে খোলা চা কিনে মিশিয়ে নিজের নামে প্যাকেট করা। ২০২৬-২৭ নিলামবর্ষে চট্টগ্রামে গড় দর ৳২৮০.৮৮ কেজি, আর দোকানে প্যাকেট চা ৳৪২৮–৬৫০।
- পুঁজি
- ৳৫ লাখ – ৳৫০ লাখ
- জনবল
- ২ – ১৫ জন
- প্রথম আয়
- ৪৫ – ১০০ দিন
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণফলের জুস ও ড্রিংকস
ফলের রস ও ফ্রুট ড্রিংকস বানিয়ে বোতলে বিক্রি। বাজারে এক লিটারের দাম ৳৮০–৯০। বিএসটিআইয়ের সিএম লাইসেন্স ছাড়া বিক্রি করলে জরিমানা — সম্প্রতি ৳৩০,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত।
- পুঁজি
- ৳৫ লাখ – ৳৩০ লাখ
- জনবল
- ৪ – ২০ জন
- প্রথম আয়
- ৯০ – ১৮০ দিন
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণবিস্কুট ও চিপস তৈরি
ময়দা, চিনি ও তেল দিয়ে বিস্কুট, টোস্ট ও চিপস তৈরি ও প্যাকেট করে বিক্রি। বিএসটিআই সনদ বাধ্যতামূলক, আর দোকানের বাকির চক্রই এই ব্যবসার আসল বাধা।
- পুঁজি
- ৳৪ লাখ – ৳৪০ লাখ
- জনবল
- ৪ – ৩০ জন
- প্রথম আয়
- ৪৫ – ১০০ দিন
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণফ্রোজেন পরোটা ও সমুচা
কাঁচা পরোটা, সমুচা ও শিঙাড়া বানিয়ে জমিয়ে প্যাকেটে বিক্রি। খুচরায় পরোটা পিস ৳১২.৫–১৯, মিনি সমুচা ৳৮.৬–৯.৪। কারখানা থেকে দোকান পর্যন্ত ঠান্ডার শিকলই এই ব্যবসার আসল শর্ত।
- পুঁজি
- ৳৩ লাখ – ৳১৫ লাখ
- জনবল
- ৩ – ১৫ জন
- প্রথম আয়
- ৪৫ – ৯০ দিন
